কাঠ ব্যবসার পাওনা ১৪ লাখ টাকার জন্য হত্যাকাণ্ডের শিকার হন যশোর জেলার অভয়নগর উপজেলার পোতাপাড়া এলাকার বাসিন্দা আব্দুল মান্নানের ছেলে মোঃ শফিকুল ইসলাম। হত্যাকাণ্ডের পর তার মরদেহ ট্রলারে উঠিয়ে বস্তায় ভরে ইট দিয়ে মাঝ নদীতে ফেলে দেওয়া হয়। আলোচিত এ হত্যাকাণ্ডের আসামি ও ট্রলার চালক দ্বীন ইসলাম গ্রেপ্তার হওয়ার পর পুলিশের কাছে চাঞ্চল্যকর এ তথ্য দেয়। পরবর্তীতে হত্যাকাণ্ডের বিবরণ জানিয়ে স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দি দিতে চাইলে গতকাল মঙ্গলবার তাকে খুলনার সিনিয়র মেট্রোপলিটন ম্যাজিস্ট্রেট আসাদুর জামানের আদালতে নেওয়া হয়। জবানবন্দি রেকর্ড শেষে আদালত তাকে কারাগারে পাঠানোর নির্দেশ দেয়।
এর আগে ২১ এপ্রিল রাত সোয়া ১২ টার দিকে বরিশালের এয়ারপোর্ট থানাধীন শেরে-ই-বাংলা রোডস্থ করিব হোসেনের চায়ের দোকানের সামনে থেকে তাকে গ্রেপ্তার করা হয়।
মামলার তদন্ত কর্মকর্তা ও পিবিআইয়ের এসআই রেজোয়ান জানান, ‘২০২৫ সালের ২৬ আগস্ট দুপুর ২টা ২৮ মিনিটের দিকে লবণচরা থানাধীন পুটিমারী কাজীবাছা নদী থেকে বস্তাবন্দি অজ্ঞাতনামা এক পুরুষের মরদেহ উদ্ধার করে নৌপুলিশ। ঘটনাস্থলে খুলনার ক্রাইমসিন টিম উপস্থিত হয়ে ওই পুরুষের পরিচয় শনাক্ত করার চেষ্টা করে। কিন্তু লাশটি অতিমাত্রায় পঁচে যাওয়ায় তার পরিচয় শনাক্ত করা সম্ভব হয়নি। পরবর্তীতে আইনানুগ ব্যবস্থা গ্রহণ শেষে আঞ্জুমান মফিদুল ইসলামের মাধ্যমে গোয়ালখালী কবরস্থানে দাফন করা হয়। মরদেহ উদ্ধার সংক্রান্তে রূপসা নৌপুলিশ লবণচরা থানায় একটি মামলা দায়ের করে।’
তিনি আরও জানান, ‘রূপসা নৌপুলিশ মামলাটি তদন্তকালে ডিএনএ পরীক্ষার মাধ্যমে মরদেহের পরিচয় শনাক্ত করতে সক্ষম হয়। তিনি যশোর জেলার অভয়নগর উপজেলার মান্নানের ছেলে মোঃ শফিকুল ইসলাম। এ বছরের ১৫ জানুয়ারি মামলাটি তদন্তের জন্য নৌ পুলিশের পরিবর্তে খুলনা পিবিআইকে নির্দেশ দেন আদালত। আদালতের নির্দেশ পেয়ে মামলাটি পিবিআইয়ের এসআই রেজোয়ান তদন্তের দায়িত্ব পান। তিনি গোপন সংবাদের মাধ্যমে জানতে পান অভয়নগর উপজেলার পাইকপাড়া গ্রামস্থ মোঃ দ্বীন ইসলাম শেখসহ আরও কয়েকজন ভিকটিম মোঃ শফিকুল ইসলামকে ২০২৫ সালের ২০ আগস্ট রাত সাড়ে ৮টার পর আর্থিক লেনদেনকে কেন্দ্র করে হত্যা করে মরদেহ বস্তায় ভরে ভৈরব নদীতে ফেলে দেয়। পরবর্তীতে রূপসা নৌপুলিশ ২৬ আগস্ট দুপুরে কাজীবাছা নদী থেকে তার মরদেহ উদ্ধার করে। হত্যাকাণ্ডের পর থেকে আসামি দ্বীন ইসলাম শেখ আত্মগোপনে চলে যায়।’
হত্যাকাণ্ড সম্পর্কে তিনি আরও জানান, ‘গত বছরের আগস্ট মাসের মাঝামাঝি সময় সন্দেহভাজন আসামি মোঃ সৌখিন সরদারসহ এ মামলার অপর এক পলাতক আসামি ট্রলার মাঝি দ্বীন ইসলাম শেখের কাছে আসে। তারা দ্বীন ইসলামকে বস্তাবন্দি হিন্দুদের মুর্তিটি নদী পার করে দেওয়ার প্রস্তাব দেয়। যার বিনিময়ে তারা দ্বীন ইসলামকে ৫ হাজার টাকা দিতে চায়। ৫ হাজার টাকার প্রলোভনে পড়ে সে ওই প্রস্তাবে রাজি হয়।’
গত ২০২৫ সালের ২০ আগস্ট রাত সাড়ে ১০টার দিকে আসামি সৌখিন ও পলাতক অপর আসামি নৌকা নিয়ে দ্বীন ইসলামকে আসতে বলে। সে তার সম্পর্কে দুলাভাই জামাল গাজীর চালিত নৌকা নিয়ে ভাটপাড়া ঘাটে আসে এবং উল্লিখিত দু’জন ওই ঘাটে আসে। দ্বীন ইসলাম ও অপর দু’আসামি নদীর কিনারায় সংরক্ষিত ২০টি ইট নৌকায় উঠায় এবং বিভাগদী শ্মশানঘাট সংলগ্ন বাগানের পাশে যায়। সৌখিন ও অপর আসামি নৌকা থেকে নেমে বস্তায়বন্দি শফিকুল ইসলামের মরদেহ নিয়ে আসে এবং তারা তিনজন বস্তাবন্দি লাশ ভৈরব নদীর মাঝখানে পানিতে ফেলে দেয়। এর আগে সৌখিন ও অপর পলাতক আসামি বস্তার মুখ খুলে কয়েকটি ইট ভরে দেয় যেন লাশটি ভেসে না উঠতে পারে। ঘটনার রাতে ট্রলার চালক দ্বীন ইসলামকে তারা ২ হাজার ৫০০ টাকা প্রদান করে। পরের দিন বাকী টাকা দেওয়া হয়। পরবর্তীতে তাদের মাধ্যমে দ্বীন ইসলাম জানতে পারে পলাতক অপর আসামি সাথে ভিকটিম শফিকুল ইসলাম কাঠের ব্যবসা করত। পাওনা ১৪ লাখ টাকাকে কেন্দ্র করে শফিকুলকে হত্যা করা হয়। তাকে বিষয়টি গোপন রাখার কথা বলা হয়। কিন্তু বিষয়টি জানা জানি হয়ে গেলে ট্রলার চালক দ্বীন ইসলাম ভয়ে এলাকা পালিয়ে যায়।
তিনি আরও জানান, আসামি দ্বীন ইসলাম খুব চালাক প্রকৃতির লোক। শুধু স্থান পরিবর্তন করত। উন্নত প্রযুক্তির সহায়তায় তাকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে।
খুলনা গেজেট/এনএম

